গ্রীষ্মের জীবনঃ

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হাবিবুর রহমান রচিত ‘বাংলাদেশের লোকসংগীত ও ভৌগলিক পরিবেশ’ বই থেকেঃ

গ্রীষ্মকালঃ বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ দুই মাস গ্রীষ্মকাল। কিন্তু সাধারণত গ্রীষ্মকাল ফাল্গুনের মধ্য হতে শুরু করে আশ্মিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর প্রভাব দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে সূর্যের কিরণ অতিশয় প্রখর। দ্বিপ্রহরে পথচলা ও কায়িক শ্রম করা কষ্টসাধ্য। যে বাতাস প্রবাহিত হয় তাও উত্তপ্ত। নদীনালা-খাল-বিল শুষ্কপ্রায়। মাঠঘাট ফেটে চৌচির। মানুষ, পশুপক্ষী জলপিপাশায় কাতর। প্রকৃতির এমনিতর অবস্থাকে গানের কথায় প্রকাশ করেছেন পল্লীগায়কঃ –

‘বেলা দ্বিপ্রহর ধু ধু ভালুচর

ধূপেতে কলিজা ফাটে বিয়োগে কাতর।

আসমান হইল টুডা টুডা জমিন হইলে ফাডা

মেঘ রাজা ঘুমাইয়া রইছে মেঘ দিব তোর কেডা।।

আলের গরু বাইন্দা গিরস্থ মরে কাইন্দা

ঘরের রমণী কান্দে ডাইল খিচুরী রাইন্দা।।

ফাইট্যা ফাইটা রইছে যত খালা বিলা নদী

জলের লাইগ্যা কাইন্দা মরে পঙ্খী জলধী।।

কপোত কপোতী কান্দে খোপেতে বসিয়া শুকনা ফুলের কুড়ি পড়ে ঝরিয়া ঝরিয়া।।’ (আব্বাস উদ্দিনের গান)

(আব্বাসউদ্দিনের কন্ঠে গানটি শুনুন)

এই সময় অনাবৃষ্টির ফলে খরা দেখা দেয়। নদীনালা ও খালবিল শুকিয়ে যায়। পানির অভাবে সেচ দেয়া সম্ভব হয় না। বলেই খেতের ফসল রৌদ্রের প্রখর উত্তাপে পুড়ে যায়। তাই লোক সংগীতেও এর যথেষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে –

‘এবারকার চৈত্যা খরায় দিল টান

পুইর‍্যা গেল খ্যাতের যত কোষ্টা ধান।’

প্রকৃতির এমনিতর পরিস্থিতিতে পল্লীর কিষাণ-কিষাণীরা জাতিধর্ম নির্বিশেষে বিধাতার কাছে প্রার্থণা জানায় ”আল্লা মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরেতুই তুই”।

বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান। এদেশের লোকজীবন কৃষিনির্ভর। অনাদি যুগ হতেই কৃষি কাজ জীবীকার অন্যতম উপায় হিসেবে চলে আসছে। এ দেশের কৃষিব্যবস্থা প্রকৃতি নির্ভর। প্রকৃতি নির্ভরতা মানুষ কে কাজেকর্মে, চিন্তা-ভাবনায় ও পালাপার্বণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে গ্রীষ্মের প্রচন্ড উত্তাপে ভূপৃষ্ঠে ও সন্নিকটস্থ বায়ূস্তর উত্তপ্ত হয়ে মেঘ, বৃষ্টি, ঝড়, বজ্রপাত ও শিলা বৃষ্টি ঘটিয়ে থাকে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়ে কৃষিনির্ভর লোকজীবনে।

মেঘবৃষ্টির প্রতি দূর্বলতা অনাদিকাল থেকে। বৃষ্টি আগমণের পারিবেশিক অবস্থা মানুষকে ভাবুক করে তোলে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বিজলীর ঝলসানো। আলোকচ্ছটা মেঘের গর্জন – সব কিছুই বৃষ্টির আগমনী বার্তার সঙ্কেত বহন করে। এ ধরনের পারবেশিক উপসর্গ হতেই লোককবি লোকসংগীত রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছে। তাঁর রচিত সংগীতে প্রকৃতি তাই একটা জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে-

‘গুরুম গুরুম ডাকে দ্যাওয়া

ডাহে আসমানে,

ঝপঝপাইয়া পানি পড়ে ব্যাইচা ভাল ক্যামনে।।’  

অথবা

‘ওত্তোরে কল্লে ম্যাঘ ম্যাঘালী

পশ্চিমে চলকিয়া উঠিল দেওয়া।

পার কর নবীন নাইয়া

আন্ডার করিয়া আইলো দেওয়া।।’

অনেক সময় শিলাবৃষ্টি হয়। ফলে ক্ষেতের ফসল ও ফলমূলের ক্ষতি হয়।  এমনি এক বৎসর শীলা বৃষ্টির ফলে গমের ক্ষতি হয়। তাই লোকগায়ক তাঁর গানে সে কথা ফুটিয়ে তেলেছেন-

‘আর এক শুন নুতন কাহিনী,

ঠিক দ্বিপ্রহরের শীল আর পানি,

মাঠে হয় কৃষাণ পেরসানি

মরিলে গহম (গম)।।’

গ্রীষ্মকালে সচারচর ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। এ সময়ে অনুষ্ঠিত ঝড়কে কালবৈশাখী ঝড় বলে। গানেও তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়-

‘একে তো বৈশাখ মাসরে

ঝড় ঝড় তুফানের ভয়

তুমি থাকো পদ্মা গাঙে

আমার মনে তুফান বয়রে।।’

নদীতে নৌ-ব্যবসা বাণিজ্য সংবতসরই চলে থাকে। বড় বড় নৌকা গ্রাম-গঞ্জ বন্দরে মালামাল বহন করে। এসব নৌকার মাঝিরা এত অভিজ্ঞ যে, এরা ঝড়বৃষ্টি সম্পর্কে পূর্বাভাস জানিয়ে থাকে। ঝড়ের পূর্বাভাস হিসেবে নদীতে ঢেউয়ের তীব্রতা বেড়ে যায় এবং আকাশে বিশেষ করে ঈশান কোণে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা যায়। প্রকৃতির ঠিক এমনি সময়েই বয়োবৃদ্ধি মাঝি অপরাপর মাঝিদেরকে হুশিয়ার করার জন্য গেয়ে উঠে-

ভৌগলিক পরিবেশ ও লোকসংগীত

‘ভরা গাঙে কল কলানী

মাঝি উথাল পাথাল ঢেউ

সাবধানে চালাইও মাঝি

সাথি নাইকো কেউ।।

ঈশান কোণে মেঘ উইঠাছে

মাঝি হারায় না ধ্যান তীর

ঝোকে ঝোকে বাইয়া চল

পরাণ রাইখ্যা ধীর।।

আগাপাছা ঠিক রাখিয়া

মাঝি সাবধানেতে চল

মাঝ দরিয়ায় উঠলে তুফান,

বদর বদর বল।।’

ঝড়ের সাথে সাথে দেখা যায় জলোচ্ছ্বাস। বিশেষ করে উপকূলবতী অঞ্চলে। এমনিতর জলোচ্ছ্বাসে একজন পল্লীগায়কের সর্বহারা হওয়ার প্রতিক্রিয়া গানের কোথায় ফুটে উঠেছে-

‘ও দরিয়ারে-

আর এমত ভিটা হোতের টানে

কাড়িয়া নিলি রে

অকূলে ডুবাইয়া আরে কি সুখ হাইলি রে

জমা গেল জনে গেল

গেলরে হকল…।।’

১৩৪৮ (বাংলা) সালের ১২ই জ্যৈষ্ঠ বরিশাল, পটুয়াখালি, ফরিদপুর ও নোয়াখাই অঞ্চল দিয়ে এক মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। এই ঝড়ের ফলে সেই অঞ্চলে প্রভূত ক্ষতি হয়। লোককবি তাঁর গানেও সেই ঘূর্ণিঝড়ের বর্ণনা করেছেন-

‘১২ই জ্যৈষ্ঠ মাসে

সন্ধ্যা হইতে উঠলো তুফান

ভোলায় কান্ডুর দ্যাশে

পরের দিন দশ ঘটিকায়

নোয়াখালী পটুয়া দিয়া

বাকেরগঞ্জ ফরিদপুর দিয়া বন্যা হইয়াছে

আর ঘোড়া গরু ভেড়া ছাগল মইরাছে

জন্তু সকল নরনারী ঘরে ঘরে।।’

অনুসন্ধান

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Search in posts
Search in pages

আর্কাইভ

বায়ুদূষণের মাত্রা

সর্বাধিক পঠিত

Sorry. No data so far.