বৈশাখের মেলাকিছু

পুতুলনাচঃ

এটি লোকনাট্যের একটি প্রাচীন মাধ্যম। পুতুল্গুলো বিভিন্ন গল্প ও কাহিনীর আলোকে দর্শকদের সামনে চরিত্র রুপায়ন করে। পুতুল্গুলি মানুষের মতই হাসিকান্না, রাগ-দুঃখ ইত্যাদি প্রকাশ করে। বৈশাখী মেলায় আজকাল পুতুল নাচের আয়োজন করা হয় যা সব বয়সি মানুষের আনন্দের খোরাক যোগায়। পুতুলনাচে সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে শুরু করে পুরাণ কাহিনীও বর্ণিত হয়।  

যাত্রা/ যাত্রাপালাঃ

লোকনাট্যের একটি  অত্যন্ত জনপ্রিয় শাখা এটি। ‘যাত্রা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ গমন বা গমনার্থে পদক্ষেপ গ্রহণ। অতীতে কোন স্থানে গমন উপলক্ষে যেসব উৎসব করা হত তা বুঝাতে যাত্রা শব্দটির আবির্ভাব ঘটে। যাত্রাদলের উদ্যোক্তাকে বলা হয় “মালিক” এবং এর সর্বময় কর্তাকে বলে “অধিকারি”। শিল্পী কলাকুশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারি মিলে প্রায় ৫০-৬০জন মিলে তৈরি হয় একটি যাত্রাদল। বর্তমানে যাত্রায় আধুনিক বাদ্যযন্ত্র যেমন হারমোনিয়াম, তবলা, অর্গান, বাঁশি, বেহালা, কঙ্গো ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। যাত্রা সাধারণত গভীর রাতে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত চলে।  যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, যাত্রার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

হালখাতাঃ

ব্যবসায়ীরা বাংলা সনের প্রথম দিনে বিগত বছরের দেনা-পাওনার হিসাব মিলিয়ে নতুন খাতা খোলেন যা হালখাতা বলে পরিচিত। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে এই হালখাতার উদ্ভব। এদিন “হালখাতা কার্ড” বিতরণের মাধ্যমে দোকানিরা খদ্দেরদের নিমন্ত্রণ যানান এবং মিষ্টিমুখ করান। খদ্দেরদের কাছ থেকে গেল বছরের পাওনা আদায়ও দোকানিদের একটি উদ্দেশ্য থাকে। হালখাতা মূলত গ্রামাঞ্চলে পালিত হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রাঃ

১৯৮৯ সালের সামরিক স্বৈরশাসনের সময়ে অমঙ্গল দূরীভূত করার একটি প্রয়াস হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থীরা শুরু করে এই শোভাযাত্রা। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিক, বিরাট আকারের প্রাণীর প্রতিকৃতি ও রঙিন মুখোশ ইত্যাদি দিয়ে এই শোভাযাত্রা সজ্জিত হয়। এটি সম্প্রতি ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নাম লিখিয়েছে।  

লাঠিখেলাঃ

উনিশ শতকে এই গ্রামীণ খেলাটি প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। বিভিন্ন সামাজিক উৎসব যেমন পুণ্যাহ ইত্যাদি উপলক্ষে ধনী কৃষক ও জমিদারের দরবারে নৈপুণ্য দেখাতে বাংলার লাঠিয়ালরা জড়ো হত এবং খেলা দেখাত। বর্তমানে বৈশাখী মেলার মত বিভিন্ন মেলায় মাঝে মাঝে এই খেলা দেখান হয়।  

মেলাঃ

বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ বৈশাখী মেলা। শহর এবং নগরাঞ্চলের প্রায় প্রতি এলাকায় সপ্তাহব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয় যা শুরু হয় বৈশাখের প্রথম দিন থেকে। এসব মেলায় দেশীয় তৈজসপত্র, মাটির, তালপাতা বা কাঠের সরঞ্জাম, তালপাতার পাখা, বাঁশি, কাঁচের রেশমি চুড়ি, আলতা, কুটির শিল্পের নানা পণ্য ইত্যাদি পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজনও থাকে যেমন নাগরদোলা, বায়স্কোপ, হাতে-মুখে আল্পনা আঁকা এবং নানান দেশীয় পিঠা ও খাবারের সমাহার।  

বাঁদরনাচঃ

বৈশাখী মেলায় অনেক সময় বাঁদরনাচ দেখানো হয়ে থাকে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বানরদের দিয়ে কোন কিছু অনুকরণ করতে বলা হয় এই আয়োজনে। কখনও কখনও একজোড়া বা একটি বানর নিয়ে এই খেলা দেখানো হয়। প্রশিক্ষক ডুগডুগি বাজিয়ে বানরদের কিছু করার নির্দেশ দেন যেমন ঘটক সাহেব মাথায় টুপি দিয়ে কিভাবে হাঁটে তা দেখানো বা বউ ঘোমটা দিয়ে কিভাবে চলে দেখানো অথবা সাধারণ নাচ ইত্যাদি অভিনয় করে দেখাতে বলা হয়। শিশুদের মধ্যে বিশেষত আয়োজনটি বিশেষ জনপ্রিয়।  

মোরগ-লড়াইঃ

বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় এ ধরণের মুরগার লড়াই বা মুরগির লড়াই দেখা যায়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোরগদের মাঝে প্রতিযোগিতা করানো হয় এ খেলায়। শক্ত ঠোঁট ও নখের মাধ্যমে মোরগরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে এবং পছন্দের মোরগের ওপর লোকে বাজীও ধরে।  

গাজনঃ

চৈত্র থেকে বর্ষার প্রারম্ভকাল পর্যন্ত সূর্যের প্রখরতা কমানো ও বৃষ্টির আশায় কৃষিজীবী মানুষেরা এ উৎসবের প্রবর্তন করেন বলে মনে করা হয়। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান আকর্ষণ। এ উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা বের করে গ্রামান্তরের শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শিব ও গৌরি বেশে দু’জন ভক্তদের সাথে নৃত্য করে। চৈত্র সংক্রান্তির এই গাজন উপলক্ষে কোথাও কোথাও কালীনাচ হয় যা বাংলার লোকনৃত্যের একটি  বিশিষ্ট নিদর্শন।