সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন

Share

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল, সূর্যসেনের নেতৃত্বে কয়েকজন উপনিবেশ বিরোধী বিপ্লবী, ব্রিটিশ পুলিশ ও তাদের সহযোগী বাহিনীর চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুটের উদ্দেশ্যে- অভিযান পরিচালনা করেন। সূর্যসেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পুরো নাম সূর্যকুমার সেন। ডাক নাম কালু। তিনি ১৯১২ সালে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে । ১৯১৬ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃঞ্চনাথ কলেজে বি.এ পড়ার সময় তিনি শিক্ষক শতীশচন্দ্র চক্রবর্তী কর্তৃক বৈপ্লবিক আদর্শে দীক্ষিত হন, যিনি ‘যুগান্তর’ নামক বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সূর্যসেন চট্টগ্রামে ফিরে গিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী একটা বিপ্লবী দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। সূর্যসেন ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে ফিরে বিপ্লবী যুগান্তর দলকে পুনরুজ্জীবিত করেন।  তিনি হয়ে ওঠেন ‘যুগান্তর’ দলের চট্টগ্রাম শাখার প্রধান। উল্লেখ্য, আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে তিনি সেসময় ‘ন্যাশনাল স্কুল’-এ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা করার কারণে তিনি পরিচিত মহলে ‘মাস্টারদা’ আখ্যা পান।

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল, রাত দশটায় অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযান শুরু হয়। সূর্য সেনের পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রাম শহরের অস্ত্রাগার দুটো লুট করা, এরপর টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করা এবং এরপর সরকারি ও সামরিক বাহিনীর অফিসারদের ক্লাব, ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলা চালানো। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো- ব্রিটিশদের অস্ত্রশস্ত্র লুট করা এবং রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পুলিশ অস্ত্রাগারের এবং লোকনাথ বাউলের নেতৃত্বে দশজনের একটি দল সাহায্যকারী বাহিনীর অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা গোলাবারুদের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন। বিপ্লবীরা সফলভাবে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হন এবং রেল চলাচল বন্ধ করে দেন। ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখা – এই নামের অধীনে সর্বমোট ৬৫ জন বিপ্লবী এই  অভিযানে অংশ নেন। অভিযান সফল করার পর বিপ্লবী দলটি পুলিশ অস্ত্রাগারে সমবেত হন এবং সেখানে মাস্টারদা সূর্য সেনকে মিলিটারী স্যালুট প্রদান করা হয়। সূর্য সেন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করেন। ভোর রাতেই বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করেন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করেন। এদের ধরার জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশিক সরকার পুরস্কার ঘোষণা করে। সূর্যসেনকে গ্রেফতার করতে না পারলেও সরকার ১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইবুনালে শুরু করে।  এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে সূর্য সেনের নির্দেশে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে সফল আক্রমণ চালান, তবে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনার পরে মাস্টারদা পটিয়ার নিকটে গৈরালা  গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ সালে, রাতে সেখানে বৈঠক করছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত। পুরস্কার টাকা বা ঈর্ষা, বা উভয়ের জন্য, ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন, সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর পুলিশকে জানিয়ে দেয়।  সেখানে অস্ত্রসহ সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। কিন্তু নেত্র সেন টাকা পাওয়ার আগেই বিপ্লবীরা তাকে মেরে ফেলে। ট্রাইব্যুনাল সূর্য সেনকে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আইনের ১২১ ধারা অনুসারে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করেন। ওই একই ধারায় তারকেশ্বর দস্তিদারের প্রতিও প্রাণদন্ডের আদেশ প্রদত্ত হয়। ১২ জানুয়ারি ১৯৩৪ সালে তারকেশ্বর দস্তিদারসহ সূর্য সেনকে ব্রিটিশ সরকার ফাঁসি কার্যকর করে। সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুড়ী দিয়ে তাঁর দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁর হাড় ও ভেঙ্গে দেয়। হাতুড়ী দিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে অত্যাচার করা হয়। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। নিষ্ঠুরভাবে তাদের অর্ধমৃতদেহ দুটি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসীর পর লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।[

সূর্য সেন ছাড়াও বিপ্লবিদের এই দলে ছিলেন গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেন, অনন্ত সিং, অপূর্ব সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেনগুপ্ত, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, শশাঙ্কশেখর দত্ত, অর্ধেন্দু দস্তিদার, হরিগোপাল বল, প্রভাসচন্দ্র বল, তারকেশ্বর দস্তিদার, মতিলাল কানুনগো, জীবন ঘোষাল, আনন্দ গুপ্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাসগুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিনচন্দ্র ঘোষ, সুবোধ দে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্ত। এদের সাথে সুবোধ রায় নামক ১৪ বছরের এক বালকও ছিলেন।

মাস্টারদাকে ধরিয়ে দেবার জন্য ব্রিটিশদের বানানো বিজ্ঞাপন।
Share

অনুসন্ধান

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Search in posts
Search in pages

আর্কাইভ

বায়ুদূষণের মাত্রা

সর্বাধিক পঠিত

Sorry. No data so far.