যাত্রাপালা

Share

লোকনাট্যের একটি  অত্যন্ত জনপ্রিয় শাখা এটি। ‘যাত্রা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ গমন বা গমনার্থে পদক্ষেপ গ্রহণ। অতীতে কোন স্থানে গমন উপলক্ষে যেসব উৎসব করা হত তা বুঝাতে যাত্রা শব্দটির আবির্ভাব ঘটে।প্রাচীন ভারতে কোনো দেবতার উৎসব উপলক্ষে নৃত্যগীতপূর্ণ যে শোভাযাত্রা বের করা হতো তাকেও যাত্রা বলা হতো। অষ্টাদশ শতক থেকে যাত্রা বিশেষভাবে প্রসার লাভ করতে থাকে। এসময়ের যাত্রাজগতে শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস প্রভৃতি প্রসিদ্ধ নাম।বিশশতকের শুরুর দিকে বাংলার জনপ্রিয় যাত্রা লেখক ছিলেন মুকুন্দ দাস। তিনি যাত্রার ভেতর দিয়ে দেশাত্মবোধ, রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রাম ও সমাজ সংস্কারের কথা প্রচার করেন।

যাত্রাদলের উদ্যোক্তাকে বলা হয় ‘মালিক’ এবং এর সর্বময় কর্তাকে বলে ‘অধিকারি’। শিল্পী কলাকুশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারি মিলে প্রায় ৫০-৬০জন মিলে তৈরি হয় একটি যাত্রাদল।খোলা আসরে সোচ্চার কণ্ঠে গান, বাধ্যযন্ত্র ও অভিনয় সহযোগে যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে যাত্রায় আধুনিক বাদ্যযন্ত্র যেমন হারমোনিয়াম, তবলা, অর্গান, বাঁশি, বেহালা, কঙ্গো ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। যাত্রা সাধারণত গভীর রাতে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত চলে। যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, যাত্রার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

যাত্রা বাংলাদেশের এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় লোকনাট্য ধারা। ধর্মীয় বা অন্য কোনো উৎসবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যে রীতি সেখান থেকেই যাত্রা শব্দের উৎপত্তি । উচ্চ শব্দ, চড়া আলো, অতি নাটকীয় ভাবভঙ্গি ও দৈত্যাকার মঞ্চে উপস্থাপন- যাত্রার মূল বৈশিষ্ট্য। বাংলার কৃষক, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার রাতের পর রাত জেগে যাত্রার কাহিনী, অভিনয়, গানের মাধ্যমে লোকজ নীতিবোধ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব নিয়ে যাত্রা দেখেছে। ষোড়শ শতকে অভিনয় কলা হিসেবে যাত্রার উদ্ভব হলেও এর বিকাশ শুরু হয় অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। একবিংশ শতকের গোড়ার দিকেই নানাকারণে যাত্রা শিল্পের অগ্রগতি থমকে যায়।

শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেও রাঢ় , বঙ্গ , গৌড় , সমতট , পুণ্ড্র , হারিকেল , চন্দ্রদ্বীপ , শ্রীহট্ট সহ সমগ্র ভূখণ্ডে,পালাগান এবং পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। তখন শিবের গাজন, রাম যাত্রা, কেষ্ট যাত্রা, সীতার বারোমাসি, রাধার বারোমাসি ইত্যাদি প্রচলিত ছিল । সে সময় মূলত পৌরাণিক কাহিনী অভিনয় করে দেখানোর মধ্য দিয়েই যাত্রা শিল্পের শুরু হয়। রক্ষিণী হরণ নামক এক কৃষ্ণ যাত্রায় চৈতন্যদেব স্বয়ং রক্ষিণী চরিত্রে অভিনয় করতেন। যাত্রার ঐতিহ্য সংরক্ষনের ক্ষেত্রে কৃষ্ণকমল গোস্বামীর নাম গুরুত্বপূর্ণ।  ১৮৬০ সালে তার রচিত স্বপ্নবিলাস ও দিব্যউন্মাদ পালার মাধ্যমে যাত্রা নতুন প্রান পায় । তার রচিত পালা দুটো ১৮৭২ ও ১৮৭৩ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত  হয়। ১৮৭৪ এ প্রকাশিত হয় তার রচিত বিচিত্র বিলাস যাত্রা পালা । এই তিনটি পালা নিয়ে গবেষণা করে নিশিকান্ত চট্টোপধ্যায় পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।

অষ্টাদশ শতকে, যাত্রা বাংলা ভূখণ্ডের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সে সময়ে শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবলদাস ছিলেন যাত্রা শিল্পের নামকরা লোক। উনবিংশ শতাব্দিতে পৌরানিক কাহিনীভিত্তিক যাত্রা খ্যাতি পায়। উনবিংশ শতকের শেষে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে দেশপ্রেমমূলক কাহিনীর অভিনয় শুরু হয়। এক্ষেত্রে সবচে প্রসিদ্ধ মুকুলন্দ দাস । তিনি যাত্রার মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজ সংস্কারমূলক বক্তব্য, যেমন- পণ প্রথা,জাতিভেদ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী বক্তব্য প্রচার করেন। তার প্রচলন করা স্বদেশী যাত্রার জন্য তাকে কারাভোগও করতে হয় । সে সময় যাত্রার মূল বিষয়গুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে এবং ধর্মীয় ও কল্পকাহিনী ছাড়াও যাত্রায় সামাজিক ও রাজনৈতিক কাহিনী জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। সে সময় ‘ইশা খাঁ’, ‘প্রতাপ চন্দ্র’, ‘বারো ভুঁইয়া’, ‘সোনাভান’, ‘সিরাজ উদ দৌলা’, ‘ক্ষুদিরাম’ ও অন্যান্য বিপ্লবীদের নামে কাহিনী অভিনয় হতে থাকে । এই সময়টাতেই, যাত্রা ‘ঐতিহাসিক’ এবং ‘রাজনৈতিক’ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

ব্রজেন্দ্র কুমার দে’কে বলা হয় ঐতিহাসিক পালার সার্থক রুপকার। ১৯৪২ সালে, তিনি রঞ্জন অপেরার জন্য লেখেন, কাল্পনিক পালা ‘রাজনন্দিনী’ । এই কাল্পনিক পালা থেকে ঐতিহাসিক পালার বিস্তার সম্পর্কে, তিনি লেখেন “আমার বর্ণিত স্বর্ণযুগে প্রথম যে পরিবর্তন এল তা হল কাল্পনিক পালার প্রবর্তন“। রঞ্জন অপেরায় অভিনীত ‘রাজনন্দিনী’র মাধ্যমে এর শুরু হয়। প্রথমদিকে, পালা পৌরাণিক ধাঁচে লেখা হত। যারা পালা রচনা করতে গিয়ে পৌরাণিক আখ্যান খুঁজে হয়রান হতেন, তাদের কাছে এক নতুন পথ খুলে গেল । যাত্রারসিকরা সঙ্গে সঙ্গে নতুন পদ্ধতিকে স্বাগত জানালেন । ক্রমে এই কাল্পনিক পালার প্রসার ঐতিহাসিক পালা রূপেও বিস্তৃত হল ।“ এছাড়াও ব্রজেন্দ্র কুমার দে’র ‘কলিঙ্গ বিজয়’ , ‘সুলতান রিজিয়া’ , ‘আধারে মুসাফির’ , ‘বর্গী এলো দেশে’ , ‘সোহরাব রুস্তম’ , ‘নবাব হোসেন শাহ্‌’ , ‘রাখীভাই’ , ‘হে অতীত কথা কও’ প্রভৃতি পালা সুখ্যাতি অর্জন করেছিল।

বাংলাদেশের যাত্রামঞ্চে সর্বাধিকবার মঞ্চস্থ হওয়া যাত্রাপালা, ‘নবাব সিরাজ উদ দৌলা’। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নাটকটি লিখেছিলেন থিয়েটার মঞ্চের জন্য। এছাড়াও বাংলাদেশে যাত্রা শিল্পের অবদানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন, মহেন্দ্র নাথ গুপ্ত কানাই লাল শীল, শান্তি রঞ্জন দে, আনন্দময় বন্দোপধ্যায়, নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, চারুবিকাশ দত্ত, উৎপল দত্ত, ভৈরবনাথ গঙ্গপধ্যায়, জিতেন্দ্রনাথ বসাক, গৌড়চন্দ্র ভড়, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, বিপিন সরকার, কানাই লাল নাথ প্রমুখ । তারা প্রত্যেকেই তাদের রচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের যাত্রা শিল্পকে প্রসিদ্ধ করেছেন । দিগিচন্দ্র বন্দ্যোপধ্যায় রচিত দুরন্ত পদ্মা পালাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পালাটি রচিত হয় । এই পালাটি ‘সোভিয়েত দেশ নেহ্রু পুরস্কার” লাভ করে । এছাড়াও নিরাপদ মন্ডল রচিত ‘মুক্তিফৌজ’, সত্যপ্রকাশ দত্তের “ বঙ্গবন্ধু মুজিবুর” যাত্রা শিল্পে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিল রুপে সংরক্ষিত ।

সত্তর দশকের শেষ দিকে এবং আশির দশকে যাত্রা শিল্পে এক নতুন ধরণের পরিবর্তন শুরু হয়। বিভিন্ন স্থানে যাত্রাপালার সাথে জুয়া-হাউজি চালু হয়। ধারণা করা হয়, ১৯৭৮-৭৯ সালে এ ধরণের পরিবর্তন শুরু হয়েছে অধিক মুনাফা প্রত্যাশীদের মাধ্যমে। দেশ অপেরার মালিক মিলন কান্তি দে’র মতে, “ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে । যেখানে ৩০০ টির বেশি দল ছিল সেখানে এখন ৩০ টি দলও সংগঠিত হচ্ছে না । যাত্রা শিল্পের নেতারা জানান ১৯৭৫ সালের পর থেকেই যাত্রাপালা আয়োজনের ওপর  বিধিনিষেধ আসতে থাকে –প্রশাসন এখন যাত্রার নামই শুনতে চায় না । যাত্রা শিল্পের সাথে জড়িত শত লেখক , শিল্পীর জীবন , জীবীকাও এখন ধ্বংসের পথে।“

বর্তমানে টিকে থাকা কিছু যাত্রা দল হল যশোরের আনন্দ অপেরা , চ্যালেঞ্জার অপেরা , অগ্রগামী নাট্য সংস্থা , মাগুরার চৈতালী অপেরা , নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায় , কহিনূর অপেরা , খুলনার স্বদেশ অপেরা রাজমহল অপেরা , রঙমহল অপেরা , লক্ষীপুরের কেয়া যাত্রা প্রভৃতি । যাত্রা বাংলার লোকজ  সংস্কৃতির মুল্যবান সম্পদ। তাই যাত্রাপালার ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পরুপ, জীবন-যাপন, কলা-কৌশল ইত্যাদি নিয়ে বিশদ গবেষণা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

বিভিন্ন যাত্রাপালার ভিডিওঃ

https://www.youtube.com/watch?v=mBaHITDasJo


প্রদায়কঃ নওশিন সিদ্দিকা ফারিহা

সুত্রঃ

.যাত্রাপালায় ইতিহাস ও রাজনীতি

২. বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য : যাত্রাপালা

৩। হারিয়ে যাচ্ছে যাত্রাপালা

Share

অনুসন্ধান

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Search in posts
Search in pages

আর্কাইভ

বায়ুদূষণের মাত্রা

সর্বাধিক পঠিত

Sorry. No data so far.