রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ড

২৪ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮.৪৫ মিনিটে ঢাকার অদূরে সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত পোশাক তৈরির কারখানার বহুতল ভবন রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ে। বনের কয়েকটি তলা নিচে দেবে যায়। কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। ভবনটির তিন তলা থেকে শুরু হয়ে নয়-তলা পর্যন্ত ছিল ৫টি তৈরি পোশাক কারখানা। নিচতলা ও দোতলায় শপিং মল। ২৭০টি দোকান। সেই সাথে বেসরকারি ব্যাংকের একটি শাখা। রানা প্লাজার ভবনটি নির্মাণের আগে সেখানে বড়সড় একটি ডোবা ছিল। বালু দিয়ে ভরাট করে সেখানে নির্মাণ করা হয় রানা প্লাজার ভবনটি। নয়তলা এই ভবনের উপরের চারতলা নির্মাণের কোনো অনুমতি ছিল না।

এই ঘটনার আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছিল। ফাটল নিয়ে সতর্ক করে ভবনের কাজও বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন সরদার এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে ঘোষণা দেন। শিল্প পুলিশ কাজ বন্ধ রাখতে বলে, কিন্তু সকল সতর্কতা বিধিনিষেধ না মেনে কয়েক হাজার তরুণ শ্রমিককে পরেরদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে জোর করে কাজ করতে পাঠানো হয়েছিল। শ্রমিকরা আতঙ্কের মধ্যেই কাজ করছিল। এরই মধ্যে কয়েকহাজার শ্রমিক সহ ভবনটি মাটিতে ধ্বসে পড়ে। হাজার হাজার তাজা জীবন নিমেষেই মাটিতে চাপা পড়ে শেষ হয়ে যায়। ঘটে যায় শিল্প ইতিহাসে তৃতীয় ভয়াবহতম এবং গার্মেন্টস শিল্পে ভয়াবহতম ট্র্যাজেডি। সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে তাদের বাধা দেয় রানা প্লাজার মালিক ও সাভার যুবলীগের নেতা সোহেল রানার সঙ্গী-সাথীরা। ভিতরে হাজার হাজার লাশ রেখেই তালা লাগিয়ে দেয়। ভেতর থেকে ভেসে আসছিলো শ্রমিকদের আর্তচিৎকার । এরই মধ্যে উদ্ধার অভিযানে চলে আসে সেনাবাহিনী। তাদের সাথে দমকল, পুলিশ ও বহু অপেশাদার স্বেচ্ছাসেবক।

ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা স্থানীয় আওয়ামী লীগ সাংসদ তৌহিদ কর মুরাদের আশ্রয়ে পালিয়ে যায়। সংসদে বলা হয়, রানা নামের কোনো নেতা সাভার যুবলীগে নেই। অপরাধী যে দলেরই হোক রেহাই নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জামাত শিবিরের হরতালকারিদের  ‘টানাহেচড়ায়’ সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে পড়তে পারে”। ধ্বস সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর মত, ‘তেমন মারাত্মক নয়’। এছাড়াও জাতীয় শোক ঘোষণা হয়। এ ঘটনার পর দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবীতে ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক আন্দোলন হয়।

বিজিএমইর হিসাবে ভবনটিতে শ্রমিক ছিল ৩১২২, যার মধ্যে বেশিরভাগই নারী। উদ্ধারকাজ শুরুর পর একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে মৃতদেহ। সেনাবাহিনী ২০ দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধারকাজ সমাপ্ত করে। মৃত্যু হয় ১১২৯ জনের। মুল উদ্ধারকাজে ২৫০০ এর ও বেশি মানুষকে গুরুতরভাবে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। যাদের অনেকেই আজীবন পঙ্গুত্ববরন করেন।  উদ্ধারের ১০০ দিন পরও নিখোঁজ থাকে ৯৯৬ জন। ৭৪টি লাশের পরিচয় জানা যায় নি ও রানা প্লাজা সম্পর্কে ঘোষিত সময়ে প্রতিবেদন তৈরি করে নি বিজিএমইএ। উদ্ধারকাজ শুরুর ১৭ দিন পর ১০ মে অলৌকিকভাবে ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে উদ্ধার হন গার্মেন্টস কর্মী রেশমা।

ভারতে পালাতে গিয়ে সোহেল রানা বেনাপোলে গ্রেপ্তার হন। ধ্বসের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের তিন বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজনের করা মামলা খারিজ করে দেয় এক মার্কিন আদালত। এছাড়াও ত্রাণ বিতরণে এসেছে বহু দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ। পুনর্বাসনের সাথে জড়িত সরকারী আমলা , মন্ত্রি ও নেতার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা চুরির অভিযোগ এসেছে। সরকারি মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেছেন, রানায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের পুনর্বাসন সঠিকভাবে হয়নি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশন এইডের বিবৃতিতে,রানা প্লাজা ধ্বসের দুই বছর পরও ৫৫% শ্রমিক বেকার রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে। ২০১৫ সালে বের হওয়া আনফিনিশড ডিউটিজ’ শীর্ষক একটি অগ্রগতি সমীক্ষার ফলাফলে বলা হয়ঃ “রানা প্লাজা ধ্বসে আহত শ্রমিকদের ৫৫ শতাংশ এখনো বেকার। বাকি ৫৪ শতাংশ শ্রমিক দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতেই এখন হিমশিম খাচ্ছেন। শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে না পারার বড় কারণ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। ৬৯ শতাংশ শ্রমিক নানা জটিলতায় ভুগছেন। ১৫ শতাংশ পছন্দসই কাজ পাচ্ছেন না। আর ৭ শতাংশ শ্রমিককে এখনো রানা প্লাজার আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ২০১৫ সালে ‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গৃহীত পদক্ষেপ: গত এক বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এই প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা কামাল বলেন, অবহেলার কারণে রানা প্লাজা দুর্ঘটনাকে আমরা অবশ্যই হত্যাকাণ্ড বলতে পারি।

অনুসন্ধান

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Search in posts
Search in pages

আর্কাইভ

বায়ুদূষণের মাত্রা

সর্বাধিক পঠিত

Sorry. No data so far.